নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যেই নতুন এক মেরুকরণ ও বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের অবমাননা করে দেওয়া একটি বিতর্কিত পোস্ট এবং পরবর্তীতে সেই অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ হওয়ার দাবি নিয়ে সংগত কারণেই প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নজিরবিহীন নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের পর জনরোষের মুখে হ্যাক হওয়ার যে দাবি জামায়াত তুলেছে, তার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘আইডি হ্যাক’ নাটক।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এ সময় তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসীন আলীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
হ্যাক হওয়ার দাবি ও টাইমিং নিয়ে বিতর্ক
মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ ‘টাইমলাইন’ তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, জামায়াত আমিরের বিতর্কিত পোস্টটি করার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে কেন অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো?
তারেক রহমানের এই উপদেষ্টা বলেন, “আমরা সবাই জানি, বর্তমান যুগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তৎক্ষণাৎ তা অন্য প্ল্যাটফর্মে জানানো হয় যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। অথচ গত ৩১ জানুয়ারি বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে পোস্টটি হওয়ার পর পুরো সময়টিতে আমিরের ফেসবুক পেজ সক্রিয় ছিল এবং সেখানে অনেকগুলো রাজনৈতিক পোস্টও করা হয়েছে। সেখানে একটি বারের জন্যও বলা হয়নি যে তাঁর ‘এক্স’ হ্যান্ডেলটি নিয়ন্ত্রণে নেই। যখন সারা দেশে ওই বক্তব্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ আর ধিক্কার শুরু হলো, ঠিক তখনই কেন মধ্যরাতের আবহে এই আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা?”
মাহদী আমিন আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে বলেন, জামায়াত দাবি করেছে তারা হাতিরঝিল থানায় রাত সাড়ে তিনটায় যে জিডি করেছে, সেখানে উল্লেখ আছে তারা বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে হ্যাক হওয়ার বিষয়টি টের পেয়েছেন। প্রশ্ন হলো—টের পাওয়ার দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা কেন পুলিশ বা জনসাধারণকে অবহিত করা হলো না? তিনি মন্তব্য করেন যে, হ্যাক হওয়ার দাবির পর আবার অবিশ্বাস্য দ্রুততায় অ্যাকাউন্টটি ফিরে পাওয়া জামায়াতের সাজানো স্ক্রিপ্টেরই একটি অংশ বলে মনে হচ্ছে।
বিতর্কিত মন্তব্যের মূলে কী ছিল?
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে একটি বিতর্কিত মন্তব্যে লিখেছেন, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসা এক ধরণের শোষন এবং এটি ‘বেশ্যাবৃত্তির’ সমতুল্য। মাহদী আমিন অত্যন্ত বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে এর অনুবাদ উদ্ধৃত করে বলেন, “তিনি বিশ্বাস করেন যখন মহিলাদের ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয় যা পতিতা বৃত্তির মতোই। এমন মধ্যযুগীয় বর্বর ও নোংরা মানসিকতা আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে কল্পনা করাও পাপ। এটি সরাসরি আমাদের কোটি কোটি কর্মজীবী নারী এবং তাঁদের আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করার শামিল।”
জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অবস্থান
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এই মুখপাত্র কেবল বর্তমান পোস্টেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি জামায়াতের সামগ্রিক নারীবিদ্বেষী ইতিহাসের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এর আগে আল-জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারেও জামায়াত আমির নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অশালীন বিশেষণে ভূষিত করা থেকে শুরু করে নারীদের কাজের সময় কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা তাদের চিরন্তন আদর্শ।
রাজনৈতিক বৈপরীত্য তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, “জামায়াত ইনসাফের বুলি আওড়ালেও ৩০০ আসনের একটিতেও কোনো নারীকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। অথচ ভোটের মাঠে আমরা দেখছি তাঁদের নারী কর্মীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি ও বিকাশের তথ্য সংগ্রহ করছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঠাঁই নেই, দলের শীর্ষপদে বসা নিষিদ্ধ—এটাই কি তাঁদের ধর্মের নামে শোষন নয়?”
জোটভুক্ত দলের ক্ষোভ ও সাইবার বুলিং
নির্বাচনী জোটে জামায়াতের থাকা নিয়ে নিজের দলের ভেতরের অস্বস্তির কথা আজ খোলাখুলি স্বীকার করেন মাহদী আমিন। তিনি অভিযোগ করেন যে, জামায়াত ও তাদের কট্টরপন্থী সাইবার ইউনিটের বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন ছাত্রদলের সাহসী নারী কর্মীরা। তাঁদের মধ্যযুগীয় কায়দায় সাইবার স্পেসে নাজেহাল করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই রাজনৈতিক অপশক্তির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য থাকায় অনেক জোটভুক্ত দলের নেত্রী পদত্যাগ করেছেন, যা বিএনপির মতো উদারপন্থী ও নারী প্রগতিতে বিশ্বাসী দলের জন্য গভীর উদ্বেগের।
নারীদের অবদানের স্বীকৃতি ও আগামীর সংগ্রাম
বক্তব্যের শেষ দিকে মাহদী আমিন শিক্ষকতা থেকে শুরু করে ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিকতা, পুলিশিং এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের অসামান্য বীরত্বের কথা উল্লেখ করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সামনের কাতারে থাকা মা-বোনদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, এই সকল পেশার নারীদের ‘বেশ্যাবৃত্তির’ সাথে তুলনা করা বা ঘরবন্দী রাখার পায়তারা একটি ভয়ংকর অশনিসংকেত। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, বিএনপি ও এর নেতৃত্ব দেশের মায়েদের মতো প্রিয় এই জনপদে এমন হীনম্মন্য ও সাম্প্রদায়িক লিঙ্গ বৈষম্য কখনোই বরদাশত করবে না।
আজকের এই সংবাদ সম্মেলনটিকে পর্যবেক্ষকরা দেখছেন বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের চরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে এক ধরণের রাজনৈতিক দূরত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে নারীদের আত্মমর্যাদা রক্ষার এই ইস্যুটি মাঠপর্যায়ে ব্যালটে বড় কোনো পরিবর্তন আনে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
