কাপাসিয়ায় কৃষক দল নেতাকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা

কাপাসিয়ায় কৃষক দল নেতাকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা: শোক ও ক্ষোভে উত্তাল গাজীপুর

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল শনিবার রাতে বাড়িতে ফেরার পথে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় গুরুতর আহত হন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ নেতা। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে শেষ পর্যন্ত আজ রোববার সকালে রাজধানী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি হলেন হেলাল উদ্দিন (৫৫), যিনি কাপাসিয়া উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিহত হেলাল উদ্দিন কাপাসিয়ার চাঁদপুর ইউনিয়নের কোটবাজালিয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং এলাকায় একজন মিষ্টভাষী ও পরোপকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর এমন আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে জেলা ও উপজেলা বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

হামলার নৃশংস বর্ণনা ও প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য
নিহতের পারিবারিক সূত্র ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে স্থানীয় বাজার থেকে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন হেলাল উদ্দিন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ৪ থেকে ৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত দেশীয় ধারালো অস্ত্র এবং ভারী লোহার শাবল নিয়ে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্রমণকারীরা পরিকল্পিতভাবে হেলাল উদ্দিনের পিঠের দিক থেকে হামলা চালায় এবং শাবল দিয়ে তাঁর শরীরে একাধিক জায়গায় জখম করে। আঘাতে হেলাল উদ্দিন নিস্তেজ হয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত অন্ধকারের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনাস্থল থেকে তাঁর কান্নার আওয়াজ পেয়ে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে তাঁর আঘাত গুরুতর হওয়ায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। অ্যাম্বুলেন্স যোগে রাতে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলেও আজ রোববার সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ
হেলাল উদ্দিনের মৃত্যুর খবর গাজীপুর জেলায় পৌঁছালে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল গাজীপুর জেলা শাখার সদস্যসচিব ফকির ইস্কান্দার আলম গভীর শোক প্রকাশ করে ‘বাংলা রয়টার্স’-কে বলেন, “হেলাল উদ্দিন ছিলেন আমাদের দলের একজন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ এবং ত্যাগী নেতা। দুর্দিনেও তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তাঁকে যেভাবে শাবল দিয়ে পিটিয়ে পিঠ ভেঙে হত্যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই এবং অনতিবিলম্বে খুনিদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।”

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অতি দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা না হয়, তবে কৃষক দলসহ সকল অঙ্গসংগঠন গাজীপুরে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

তদন্ত ও পুলিশের বক্তব্য
এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ শুরু করেছে কাপাসিয়া থানা পুলিশ। কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম মামলার অগ্রগতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত কলহের বিষয়টিও পুলিশের নজরে এসেছে।

ওসি শাহীনুর আলম জানান, “নিহত হেলাল উদ্দিনের ভাতিজার সাথে একটি মুঠোফোন (মোবাইল) চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনের তর্কবিতর্ক এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ঘটনার আগের দিন। আমরা ওই সূত্রের সূত্র ধরে তদন্ত পরিচালনা করছি যে এটি কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নাকি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। ইতিমধ্যে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে এবং অভিযোগ দায়ের হলে আমরা দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেব।”

পুলিশের ভাষ্যমতে, নিহতের পরিবার থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এজাহার দেওয়া না হলেও তারা ছায়াতদন্ত শুরু করেছেন। ঘটনার পর থেকে চাঁদপুর ইউনিয়নের কোটবাজালিয়া গ্রামে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করার চিন্তাভাবনা চলছে।

বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া
হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী, সন্তান এবং স্বজনরা এখন শোকাতুর। তারা দাবি করছেন, চোর বা ব্যক্তিগত শত্রু নয়, রাজনৈতিক শত্রুতা থেকেই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে জনশূন্য পথে হামলা চালিয়ে তাঁর কোমর ও মেরুদণ্ড গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি পঙ্গু হয়ে যান, যা ছিল চরম নিষ্ঠুরতা।

গাজীপুর জেলার রাজনৈতিক মহলে এই খুনের ঘটনা বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। আগামী জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের আগে এমন জ্যেষ্ঠ একজন নেতার খুনের ঘটনায় দলীয় মেরুকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নিহতের স্বজনরা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর লাশ এলাকায় নেওয়া হলে জানাজার সময় বিশাল জমায়েতের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য এক চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বর্তমানে পুরো কাপাসিয়া উপজেলা জুড়ে একটাই আলোচনা—হেলাল উদ্দিনের মতো শান্তশিষ্ট একজন নেতা কেন এমন করুণ পরিণতির শিকার হলেন। অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং উপযুক্ত শাস্তির বিধান নিশ্চিত করাই এখন পুলিশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলা রয়টার্স সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্যের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন