দেশের ক্রমবর্ধমান এভিয়েশন সেক্টরে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন হাজারো তরুণ-তরুণী। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং যথাযথ গ্রুমিংয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়ার সেই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং তরুণ প্রজন্মকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজধানীর উত্তরায় অনুষ্ঠিত হলো এক বর্ণাঢ্য ‘ফ্রি কেবিন ক্রু ফটোসেশান ও গাইডলাইন বিষয়ক সেমিনার’।
তরুণ প্রজন্মের মাঝে পেশাদার বিমানসেবিকা বা কেবিন ক্রু হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহ জাগাতে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি গ্রহণ করে ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং প্রতিষ্ঠান ‘ক্রু ল্যাব বাংলাদেশ’। গত সপ্তাহে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত পাপা চিনোস ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রায় ৪০ জনের বেশি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীন এই সেশনগুলোতে এভিয়েশন জগতের নানামুখী জ্ঞান ও দক্ষতার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।
এভিয়েশন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও মানসিক প্রস্তুতি, ব্যক্তিত্ব এবং যোগাযোগের দক্ষতা অধিক গুরুত্ব বহন করে। সেমিনারের সূচনায় ক্রু ল্যাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগত সকল প্রার্থীদের কেবিন ক্রু প্রস্তুতির একটি সামগ্রিক রূপরেখা প্রদান করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি ‘প্রফেশনাল ফটোশুট’ করার সুযোগ, যা কেবিন ক্রু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতি প্রয়োজনীয়।
এছাড়া বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসগুলোর উপযোগী করে কীভাবে একটি স্মার্ট ‘কারিকুলাম ভিটা’ বা সিভি (CV) তৈরি করতে হয়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পেশাদার গ্রুমিং এর অংশ হিসেবে ছিল উপস্থিত প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে সাজসজ্জার ধরণ এবং ইউনিফর্ম পরার সময় বিশেষ আদবকেতা শিক্ষা দেওয়া। এভিয়েশন জগতের একজন সফল ক্যারিয়ার ব্যক্তিত্ব সুদেব রাজবংশী তাঁর বক্তব্যে কেবিন ক্রু হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা কঠোর প্রশিক্ষণ এবং শারীরিক ফিটনেসের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ছিলেন সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সার্টিফাইড প্রাক্তন কেবিন ক্রু ট্রেইনার। তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা তরুণদের মনে বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। বর্তমান যুগের চাকরির বাজারে নিজের একটি উজ্জ্বল ইমেজ বা ডিজিটাল ইমেজ থাকা একান্ত জরুরি। এই বিষয়ে গাইডলাইন প্রদান করেন ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট মুনতাসীর মুকিত।সেমিনারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন এয়ারলাইনসে কর্মরত বর্তমান কেবিন ক্রুদের সরাসরি উপস্থিতি। তাঁরা ব্যক্তিগত গল্প শেয়ার করার পাশাপাশি ওপেন কোশ্চেন অ্যান্ড আনসার (Q&A) সেশনে প্রার্থীদের সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সমাধান দেন।
বিমানসেবিকা হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের বিভিন্ন পদে এবং অপারেশনাল শাখায় কাজের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এই সেশনের মাধ্যমে। বিমানবালা হওয়া মানে কেবল বিমানে যাত্রীদের খাবার সরবরাহ করা নয়, বরং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা। সেমিনারে পারসোনালিটি ডেভেলপমেন্টের ওপর দীর্ঘ সেশন নেওয়া হয়।
এখানে একজন ক্রু কীভাবে হাঁটবেন, কীভাবে কথা বলবেন এবং সংকটময় অবস্থায় কীভাবে ব্যক্তিত্ব বজায় রাখবেন, তা হাতে-কলমে দেখানো হয়। অংশগ্রহণকারী উম্মে সায়মা জানান, “আমি দীর্ঘ সময় ধরে কেবিন ক্রু হতে চেয়েছি কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করব জানতাম না। আজকের এই ফ্রি সেমিনারটি আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। বিশেষ করে বিনামূল্যে প্রফেশনাল ফটোসুট এবং বর্তমান ক্রুদের থেকে দিকনির্দেশনা পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।”
উল্লেখ্য যে, এই অনুষ্ঠানটি অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ ফ্রী এবং সকল প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সুস্বাদু লাঞ্চের বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল আয়োজকদের পক্ষ থেকে। সেমিনার শেষে আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘ক্রু ল্যাব বাংলাদেশ’-এর কর্ণধার এভিয়েশন ক্যারিয়ারকে আরও জনপ্রিয় করতে নতুন ঘোষণা দেন। চলতি মাস থেকেই তারা পূর্ণাঙ্গ ‘কেবিন ক্রু প্রস্তুতিমূলক কোর্স’ শুরু করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের উদীয়মান এভিয়েশন খাত, যেখানে এয়ার আস্ত্রা, ইউএস-বাংলা এবং নতুনভাবে তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন জনশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে, সেই ঘাটতি পূরণেই তাদের এই উদ্যোগ। উদ্বোধনী কোর্স উপলক্ষ্যে ক্রু ল্যাব বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে যে, তাদের প্রথম ব্যাচের জন্য সকল ছাত্রছাত্রী পাবেন নির্ধারিত ফির ওপর ‘৫০ শতাংশ বিশেষ ছাড়’।
এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ আরও সহজ হবে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় এখন অনেক এয়ারলাইনস তাদের রুট প্রসারিত করছে। এমন সময়ে পেশাদার ও সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী গড়ে তোলায় ‘ক্রু ল্যাব বাংলাদেশ’-এর মতো প্লাটফর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করা যায়।
