রাজশাহীর বাগমারায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি আওয়ামী লীগ নেতা

রাজশাহীর বাগমারায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি আওয়ামী লীগ নেতা: নেপথ্যে জামায়াতকে সমর্থন ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই

দেশের রাজনীতির আকাশে অস্থিরতার মেঘ কাটতে না কাটতেই তৃণমূল পর্যায়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার পাশাপাশি তাঁর মোটরসাইকেল ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য দলীয় কর্মীদের উৎসাহিত করার ‘অজুহাতে’ এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। হামলায় ওই নেতার দুই ভাতিজাও আহত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণের ভয়ে মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী পরিবারটি।


ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের সাদোপাড়া গ্রামে। আহত আওয়ামী লীগ নেতার নাম মুহিদুল ইসলাম (৪৮)। তিনি শ্রীপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং পেশায় একজন পল্লী চিকিৎসক। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুহিদুল ইসলাম তাঁর পেশাগত কাজ শেষে নিজস্ব মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে তিনি সাদোপাড়া ডাকঘরের সামনে পৌঁছালে ওত পেতে থাকা একদল হামলাকারী তাঁর পথরোধ করে। হামলাকারীদের মধ্যে একই গ্রামের বাসিন্দা এবং বিএনপি কর্মী হিসেবে পরিচিত মোজাম্মেল হক ও আরিফুল ইসলামসহ আরও ৪-৫ জন উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।


হামলাকারীরা মুহিদুল ইসলামের গতিরোধ করেই তাঁর ওপর চড়াও হন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মুহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীদের আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচনী প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’য় ভোট দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করছেন। উল্লেখ্য, স্থানীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের একটি অংশের সাথে জামায়াতের গোপন আঁতাতের খবর নিয়ে এলাকায় আগে থেকেই গুঞ্জন ছিল। তবে মুহিদুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং একে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাঁর এই প্রতিবাদের পর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিএনপির কর্মীরা।

শুরুতে কথা কাটাকাটি হলেও মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেয়। হামলাকারীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে মুহিদুল ইসলামের ওপর হামলা চালায়। তাঁর চিৎকারে তাঁর দুই ভাতিজা খাইরুল ইসলাম (২৩) ও রাতুল ইসলাম (১৭) ঘটনাস্থলে ছুটে এলে তাঁদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। হামলাকারীরা দুই তরুণকেও পিটিয়ে রক্তাক্ত করে এবং মুহিদুল ইসলামের মোটরসাইকেলটি ভাঙচুর করে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে।

হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্বজনরা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত তাহেরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মুহিদুল ইসলামের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে এবং তাঁর ভাতিজা খাইরুল ইসলামের বাম হাতের হাড় ভেঙে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁরা বাড়িতে ফিরলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে তাঁরা ভেঙে পড়েছেন।

আহত খাইরুল ইসলাম অত্যন্ত ভয়ার্ত কণ্ঠে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি। যদি মামলা করি, তবে আমাদের এলাকায় থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ওরা আমাদের এলাকাছাড়া করার হুমকি দিচ্ছে, তাই আমরা মামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এই হামলার পেছনে শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাম পারভেজের প্রত্যক্ষ মদত ও নির্দেশনা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই হামলা চালানো হয়েছে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাম পারভেজ হামলার কথা স্বীকার করলেও বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের ওই নেতাকে সামান্য চড়থাপ্পড় দেওয়া হয়েছে মাত্র। এটি মূলত ২০২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তখন আমি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার সময় তিনি আমাকে অনেক বিরক্ত করেছিলেন। এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি, এটি তেমন বড় কোনো ঘটনা নয়।”

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।”

রাজশাহীর বাগমারার এই ঘটনাটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক প্রবীণ রাজনীতিবিদের মতে, “তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন এবং সহনশীলতার অভাব এই ধরনের সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে। যখন কেউ মামলা করতে ভয় পায়, তখন বুঝতে হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতটা জেঁকে বসেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু শারীরিক আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

আওয়ামী লীগ নেতা মুহিদুল ইসলামের ওপর হামলার এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের বিরোধের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ভুক্তভোগী পরিবারের মামলা না করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও নিরাপত্তার অভাব বোধ কাজ করছে। প্রশাসন যদি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে না পারে, তবে বাগমারার মতো এলাকাগুলোতে সংঘাতের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন