জেফরি এপস্টেইন ও নোয়াম চমস্কির গোপন ই-মেইল চালাচালি

জেফরি এপস্টেইন ও নোয়াম চমস্কির গোপন ই-মেইল চালাচালি

বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদ, দার্শনিক এবং মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা নোয়াম চমস্কির সঙ্গে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত নতুন কিছু নথি থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালে যৌন পাচারের অভিযোগে জর্জরিত এপস্টেইন নিজের ভাবমূর্তি রক্ষায় চমস্কির কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। এপস্টেইন তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোকে ‘নোংরা’ বলে অভিহিত করেন এবং এর প্রত্যুত্তরে চমস্কি তাঁকে সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে সাংবাদিকদের ‘শকুন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে—যখন মায়ামি হেরাল্ডসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এপস্টেইনের ২০০৮ সালের বিতর্কিত সমঝোতা চুক্তি এবং তাঁর নারীদের পাচারের নেটওয়ার্ক নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল—তখন এপস্টেইন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি নোয়াম চমস্কিকে একটি ই-মেইল পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, “নোয়াম, এই নোংরা সংবাদমাধ্যমের চাপ আমি কীভাবে সামলাব, সে বিষয়ে আপনার পরামর্শ চাই।” তিনি আরও যোগ করেন যে, পরিস্থিতি তাঁর ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যাচ্ছে।

এপস্টেইন জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কি কোনো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে উপসম্পাদকীয় (Op-ed) লিখে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন, নাকি বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করবেন? তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতার উন্মাদনা’ হিসেবে অভিহিত করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

এপস্টেইনের বার্তার জবাবে চমস্কির ই-মেইল অ্যাকাউন্ট থেকে যে উত্তরটি পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। চমস্কি তাঁকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখানোর পরামর্শ দিয়ে লেখেন, “এই শকুনেরা (সংবাদকর্মী) খুব করে চায় আপনি জনসমক্ষে মন্তব্য করুন। আর এটিই আপনার বিরুদ্ধে আরও বিষাক্ত আক্রমণের সুযোগ করে দেবে।”

চমস্কি সেই ই-মেইলে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়েও তীব্র মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, নারীদের ওপর নির্যাতন নিয়ে সমাজে এক ধরনের ‘উন্মাদনা’ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও লেখেন, “অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো অভিযোগ নিয়ে সামান্যতম প্রশ্ন তোলাকেও এখন হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।” চমস্কির এই মন্তব্যটি বর্তমান সময়ের ‘ক্যানসেল কালচার’ বা সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের কঠোর সমালোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রকাশিত নথি থেকে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, চমস্কি ও তাঁর স্ত্রী ভ্যালেরিয়া নিজেদের ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সন্তানদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও এপস্টেইনের ওপর গভীর আস্থা রাখতেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্যালেরিয়া চমস্কি এপস্টেইনকে একটি ই-মেইল লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তাঁদের সন্তানদের কাছে আর্থিক অবস্থা ব্যাখ্যা করার বিষয়ে এপস্টেইনের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। ভ্যালেরিয়া লিখেছিলেন, “আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি, তাই নির্দ্বিধায় পরামর্শ দিন।”

উল্লেখ্য, এর আগের বছরের এক নথিতে দেখা গিয়েছিল যে, চমস্কি ও এপস্টেইনের মধ্যে কয়েক বছর ধরে নিবিড় যোগাযোগ ছিল। এমনকি এপস্টেইন তাঁকে নিজের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ‘দীর্ঘ ও গভীর’ একাডেমিক আলোচনা চলত।

৯৭ বছর বয়সী নোয়াম চমস্কি গত বছর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাক্ষাৎকারে এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এটি আপনার বা অন্য কারও জানার বিষয় নয়। আমি তাঁকে চিনতাম এবং মাঝেমধ্যে আমাদের দেখা হতো—ব্যাস এটুকুই।” তবে নতুন প্রকাশিত এই নথিগুলো প্রমাণ করে যে, তাঁদের সম্পর্ক কেবল সাধারণ পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পরামর্শের পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

জেফরি এপস্টেইনকে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার এবং যৌন শোষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এক দশক আগে ফ্লোরিডায় একই ধরনের অভিযোগে তিনি লঘু সাজা পেয়ে পার পেয়ে গিয়েছিলেন, যা নিয়ে মার্কিন বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বিচার শুরু হওয়ার আগেই রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ একে আত্মহত্যা বলে দাবি করলেও তা নিয়ে আজও নানা রহস্য ডালপালা মেলে আছে।

চমস্কির মতো একজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, যিনি সর্বদা শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেন, তাঁর এমন একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেককেই হতাশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চমস্কির এই ই-মেইলগুলো বাক-স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থানের প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু একজন প্রমাণিত যৌন অপরাধীর প্রতি তাঁর সহানুভূতি প্রশ্নাতীত নয়।

বিবিসির পক্ষ থেকে এই নথির বিষয়ে চমস্কির স্ত্রী ভ্যালেরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নথিতে নাম থাকা মানেই যে চমস্কি কোনো অপরাধের সাথে জড়িত, বিষয়টি তেমন নয় বলে স্পষ্ট করেছে মার্কিন তদন্ত সংস্থা।

এই নতুন তথ্যগুলো এপস্টেইনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের ওপর আরও একবার আলোকপাত করল, যেখানে রাজনীতি, বিজ্ঞান এবং দর্শনের বড় বড় রথী-মহারথীরা কোনো না কোনোভাবে তাঁর সাথে যুক্ত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন