বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে গত পাঁচ দিন ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষ ও কর্মবিরতির ফলে দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপিওয়ার্ল্ড’-এর কাছে বন্দরের টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই ধর্মঘটে থমকে গেছে চাকা। এর ফলে শত শত কনটেইনার ভর্তি তৈরি পোশাক সময়মতো জাহাজে উঠতে না পেরে সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো ট্রানজিট পোর্টের ‘মাদার ভেসেল’ বা বড় জাহাজ ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বস্ততা নিয়েও বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।
ঢাকার স্বনামধন্য বায়িং হাউস ‘ট্যাড সোর্সিং লিমিটেড’-এর উদাহরণ এক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১২০ কনটেইনার ভর্তি তৈরি পোশাক বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়ে আছে। জার্মানির দুটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের এই পণ্যগুলো গত সপ্তাহে জাহাজে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু বন্দরের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থার কারণে সেগুলো বন্দরেই পড়ে রয়েছে। ট্যাড সোর্সিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান বাংলা রয়টার্সকে জানান, “সিঙ্গাপুর বন্দরে আমাদের জন্য নির্ধারিত মাদার ভেসেলটি ইতিমধ্যে ছেড়ে গেছে। এখন এই পণ্যগুলো পাঠাতে আমাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। ক্রেতারা ইতিমধ্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছেন এবং তাঁরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। দ্রুত সমাধান না হলে আমাদের ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকিতে পড়তে হবে।”
কেবল ট্যাড সোর্সিং নয়, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৮০০ কনটেইনার কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকায় তাদের প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া তাদের রপ্তানিযোগ্য ২৫০ কনটেইনার খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য ডিপোতে পড়ে আছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “সময়মতো খাদ্যপণ্য পৌঁছাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, যা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
সাভারের এন আর ক্রিয়েশনস এবং স্প্যারো গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সমস্যার মুখোমুখি। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তাঁদের প্রায় দেড় লাখ তৈরি পোশাক বন্দরে আটকা। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের পোশাক রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে সামান্য দেরিও পুরো মৌসুমের ব্যবসায় ধস নামাতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এই আন্দোলন চলছে। গত শনিবার থেকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর গত মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যান আন্দোলনকারীরা। তাঁদের প্রধান দাবি, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। গতকাল বিকেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর আন্দোলনকারীরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। তবে তাঁদের চার দফা দাবি মানা না হলে পুনরায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে ১০টি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ঢাকা চেম্বার (ডিসিআইআই) এবং মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতারা এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে জানানো হয়, দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এমন একটি সংবেদনশীল স্থাপনায় দিনের পর দিন অচলাবস্থা কাম্য নয়।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “দাবি আদায়ের জন্য বন্দর বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই আগুন দিয়ে জ্বালানো। আমরা শ্রমিক ভাইদের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আপনারা কাজে ফিরুন।” বিজিএমইএ-র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান সতর্ক করে বলেন, “একদিকে ক্রয়াদেশের অভাব, অন্যদিকে বন্দরের এই বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে পোশাক খাত এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।”
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির (বিকডা) তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় ছিল প্রায় ৮ হাজার একক কনটেইনার। ধর্মঘটের প্রভাবে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫০০-তে। বিকডা-র মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, “কর্মসূচি স্থগিত হওয়ার পর গতকাল বিকেল থেকে পণ্য বন্দরে নেওয়া শুরু হয়েছে। তবে যে পরিমাণ জট তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক হতে অন্তত এক সপ্তাহ নিরবচ্ছিন্ন কাজ প্রয়োজন।”
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল একটি স্থানীয় শ্রমিক অসন্তোষ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সমতুল্য একটি সংকট। অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত এই বন্দরের কার্যকারিতা সামান্য ব্যাহত হলেও তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে বিশ্ববাজারের রপ্তানি আয় পর্যন্ত। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশীয় সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
